ফরহাদ মজহারের গণ-অভ্যুত্থান ও বামপন্থার সমালোচনা প্রসঙ্গে
- তফাজ্জল হোসেন: প্রবীণ রাজনীতিবিদ জনাব বদরুদ্দীন উমর এক আলোচনা সভায় নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি’র সমালোচনা করেছেন। জনাব উমর বলেন- ‘ছাত্রদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয়েছে সেটা যে একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সে রকম কিছু নয়। গণ-অভ্যুত্থান যেটা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে একটা বিস্ফোরণের মতো ব্যাপার। একটা হলো দীর্ঘদিনের গণ-আন্দোলনের শীর্ষে গিয়ে একটা অভ্যুত্থান, আরেকটা হলো কোনো আন্দোলন করতে না পেরে দীর্ঘদিনের একটা ক্ষোভ ধামাচাপা থাকার ফলে একটা পরিস্থিতি। বাংলাদেশে দ্বিতীয় ধরনের অবস্থা তৈরি হয়েছিল।’ জনাব উমর বা তাঁর নেতৃত্বাধীন দল জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের আগের বক্তব্যের চেয়ে এই বক্তব্য ভিন্ন। মুক্তি কাউন্সিল ড. ইউনুসের সরকারকে গণ-অভ্যুত্থানের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সে কারণে প্রফেসর ইউনুসের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য কমিশন বা সংস্কার কর্মসূচিতেও মুক্তি কাউন্সিল অংশগ্রহণ করে। এমনকি যে সভায় জনাব উমর জুলাই আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে অস্বীকার করেছেন সেই আলোচনা সভার বিষয়বস্তু ছিল ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের এক বছরের পূর্তির আলোচনা সভা’। ফলে জনাব উমর স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছেন এবং জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মুক্তি কাউন্সিলের রাজনৈতিক অবস্থান যেভাবে উন্মেচিত হয়েছে তা এতদিনকার জনাব উমরের ইমেজ ছিল তা নি:সন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যাক এই প্রবন্ধে জনাব উমর বা মুক্তি কাউন্সিলের রাজনৈতিক স্বরুপ নিয়ে মূল আলোচনা নয়। এখানে বরং আলোচনা করতে চাই জনাব উমরের সমালোচনা নিয়ে আরেক প্রবীণ বুদ্ধিজীবি (!) জনাব ফরহাদ মজহারের সমালোচনা বিষয়ক একটি লেখা প্রসঙ্গে। জনাব উমরকে সমালোচনা করতে যেয়ে তিনি যে নিবন্ধটি লিখেছেন সেটির নাম দিয়েছেন ‘গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গীয় বামপন্থার সমস্যা’। জনাব মজহার যেসব বিষয়ে সমালোচনা করেছেন সেগুলো সকলের বোঝার সুবিধার্থে বক্তব্যের মূল বিষয়গুলি পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করে তার বক্তব্যের স্বরুপ তুলে ধরার চেষ্টা করছি-
জনাব উমরের উদ্ধৃতি দিয়ে জনাব মজহার লিখেছেন- ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান বিরোধী চরম প্রতিক্রিয়াশীল বামপন্থার এটাই প্রধান সমালোচনা। এই যুক্তিতে তারা জুলাই গণ অভ্যুত্থানকে অস্বীকার ও নিন্দা করেন। এই ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের সঙ্গে পরাজিত আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির কোন পার্থক্য নাই।’ এই আলোচনায় মজহার সাহেব জনাব উমরকে প্রতিক্রিয়াশীল বামপন্থি বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ‘প্রতিক্রিয়াশীল বামপন্থি’ বলতে জনাব মজহার কি বুঝিয়েছেন তা পরিস্কার করেন নি। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী কমিউনিস্ট রাজনীতিকে কোণঠাসা করতে কথায় কথায় ‘বামপন্থি’ বলে উপহাস, গালিগালাজ করে। মজহার সাহেবও তাদের দলে মিশে প্রতিক্রিয়াশীলদের গলার স্বর আরেকটু মোটা করা ছাড়া বামপন্থি সম্পর্কে তেমন কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবেন বলে সন্দেহ রয়েছে। বরং যা বোঝা যায়, মজহার সাহেব ‘বামপন্থা’ ও ‘ প্রলেতারীয় কমিউনিস্টকে’ একসাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু লেনিন সুনির্দিষ্টভাবে বামপন্থা যে কমিউনিস্ট নয় তা পরিস্কার করেছেন। ‘বামপন্থি ছেলেমানুষি ও পেটি বুর্জোয়াপনা’ গ্রন্থে লেনিন বলেন- ‘বামপন্থি কমিউনিস্টরা, যারা আবার নিজেদের প্রলেতারীয় কমিউনিস্ট বলতেও ভালোবাসে- প্রলেতারীয় তাদের মধ্যে খুবই কম এবং পেটি বুর্জোয়াত্ব খুবই বেশি।’ লেনিন আরও বলেন- ‘বামপন্থিরা প্রলেতারীয় লৌহ শৃঙ্খলা ও তার প্রস্তুতির কথাটা একদম বোঝে না, শ্রেণীচ্যুত পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবির মনোবৃত্তিতে তারা একেবারে আচ্ছন্ন’। লেনিনের এই সংজ্ঞামতে জনাব মজহার তিনি কি নিজেকে ‘প্রলেতারীয় কমিউনিস্ট’ ভাবেন? যাক, বলীবর্দকে হাসানো আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়।
মজহার সাহেব জনাব উমরকে বামপন্থি হিসেবে অভিযুক্ত করে তাকে আওয়ামীলীগ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির সমগোত্রীয় করেছেন। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারকে সম্বোধন করতে যেয়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি দেশের ‘বামপন্থি’ ও ‘ডানপন্থি’ সকল রাজনৈতিক নেতাদের মুখে বহুল প্রচারিত হচ্ছে। তাদের সাথে জনাব মজহারেরও কোন পার্থক্য নেই। তিনিও দেদারসে কথায় কথায় স্বৈরাচারী সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ সম্বোধন করে যাচ্ছেন। আসলে স্বৈরাচারী হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলার ক্ষেত্রে কোনো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কি তারা কোথাও দিয়েছেন? সেরকম কিছু চোখে পড়ে নি। সবাই কথায় কথায় এই ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ আওড়াচ্ছে। কিন্তু মজহারের বেলায় তা প্রযোজ্য নয়, তিনি না বুঝে বলার লোক নন। তিনি অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তি, তাই সচেতনভাবেই হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ সাজিয়ে আসল ফ্যাসিস্টকে আড়াল করছেন। তাহলে ফ্যাসিজম আসলে কি, তা আমাদের আগে জানা দরকার। তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যকরী সমিতির ত্রয়োদশ প্লেনাম অধিবেশনে বলা হয়- ‘ফ্যাসিজম হল, যোগানদার পুঁজি (ফিনান্স ক্যাপিটাল) তরফের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদীঅংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব।’ বিখ্যাত দিমিত্রভ থিসিসে বলা হয়, ‘ফ্যাসিজম যোগানদার পুঁজিরই রাষ্ট্রশক্তি’। বাংলাদেশ কি যোগানদার পুঁজি অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির দেশ? আওয়ামীলীগ কি এই সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির প্রতিনিধিত্বকারী সরকার ছিল? আর্থ-সামাজিক অবস্থাদৃষ্টে বাংলাদেশ একটি নয়া ঔপনিবেশিক আধা-সামন্তবাদী রাষ্ট্র। এটি যোগানদার পুঁজি অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির বিনিয়োগ ক্ষেত্র। এদেশের শিল্প-কারখানায় বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে অবাধ মুনাফা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজি এদেশের বিভিন্ন এনজিও গোষ্ঠীর উপর ফান্ডিং করে একদিকে যেমন গ্রাম পর্যন্ত তার শোষণের জাল বিস্তৃত করছে, তেমনি এদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে এসব এনজিও গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন দালাল সৃষ্টিসহ সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ছিল সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকার, যেমনটি ক্ষমতাসীন প্রফেসর ইউনুসের সরকার। সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভর করে এই দালাল সরকারগুলো এবং আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজি আমাদের জনগণের উপর শোষণ-নিপীড়ন চালায়। এ প্রেক্ষিতে একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে- একটি কারখানায় শ্রমিকদের উপর প্রত্যক্ষ নিপীড়ন চালায় কারখানার সুপারভাইজার, ইনচার্জ বা ম্যানেজার পর্যায়ের স্টাফরা। কিন্তু এই স্টাফরা শ্রমিকদের উপর শোষণ-নির্যাতন চালানোর জন্য তার মালিক দ্বারা আদিষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু কারখানার শ্রেণী অসচেতন শ্রমিকরা মনে করে তাদের উপর নিপীড়নের মূল হোতা হচ্ছে তাদের সুপারভাইজর ও ইনচার্জ। এর মধ্য দিয়ে কারখানার মালিক শ্রমিকদের রোষানল থেকে আড়ালে থাকার সুযোগ পায়। তবে সচেতন শ্রমিকরা তাদের নির্যাতনের প্রেক্ষিতে স্টাফদের অভিযুক্ত না করে মালিকের বিরুদ্ধেই সংগ্রামটি জারি রাখে। এরকমভাবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ ক্ষোভ ক্ষমতাসীন সরকারের উপরে থাকলেও এই ক্ষোভ পরিণত হয়ে সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদ না করলে এক দালালের পরিবর্তে আরেক দালাল পুনর্বাসিত হবে। যেমনটি জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। আসলে ‘ফ্যাসিস্ট’ যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ অর্থাৎ মূল হোতা হিসেবে হাজির করে জনগণের জানি দুশমন ফ্যাসিস্ট শক্তি সাম্রাজ্যবাদকে মজহার সাহেবেরা আড়াল করেছেন।
মজহার সাহেব বদরুদ্দীন উমরের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন- ‘৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী হয়েছে। এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। তাদের একটা উত্থান হয়েছে এবং ছাত্রদের নেতৃত্বে যে পার্টি হয়েছে, সে পার্টির বক্তব্যে শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষ নিয়ে কোনো কথা নাই। তারা ভাবছে ধর্মকে ব্যবহার করবে। সে জন্য তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’ এই উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার’ জনাব উমরের কাছে প্রধান ইস্যু। মজহার সাহেবের এই সমালোচনা সঠিক যে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের ইস্যুটিকে প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখা কোনভাবেই যথাযথ হবে না। কারণ ধর্ম ভিত্তিক সামন্তীয় সমাজকে উচ্ছেদ করেছে বুর্জোয়া শ্রেণী। বুর্জোয়া শ্রেণী শুধু ধর্মকেই উচ্ছেদ করে নি, সামন্তীয় সমাজের সমস্ত ঐতিহ্য ও পবিত্র সম্পর্কিয় বিষয়গুলোও উচ্ছেদ করেছে। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে- “ঐতিহাসিক বিচারে বুর্জোয়া শ্রেণী খুবই বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছে। বুর্জোয়া শ্রেণী যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক, নির্দোষ সরল সম্পর্ক খতম করে দিয়েছে। যেসব বিচিত্র সামন্ততান্ত্রিক বন্ধনে মানুষ বাঁধা ছিল তার ‘স্বাভাবিক উর্দ্ধতনদের’ কাছে তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। নগ্ন স্বার্থ ছাড়া, নির্মম ‘নগদ লেনদেন’ ছাড়া এরা মানুষের সঙ্গে মানুষের আর কোনো বন্ধন বাকি রাখে নি। আত্মসর্বস্ব হিসাব-নিকাশের বরফ-জলে এরা ডুবিয়ে মেরেছে ধর্ম-উন্মাদনার প্রশান্তদিব্য ভাবোচ্ছ্বাস, শৌর্যমন্ডিত উৎসাহ ও কূপমুন্ডুক ভাবালুতা।” অথচ মজহার সাহেব ধর্মকে উচ্ছেদ করার দায়ে বুর্জোয়াদের অভিযুক্ত না করে তিনি অভিযুক্ত করছেন বীর্যহীন ‘বামপন্থিদের’। মজহার সাহেব ধর্মকে বাতিল করার জন্য বুর্জোয়াদের কেন অভিযুক্ত করলেন না? এর কারণ বের করা খুব কঠিন নয়। কারণ এই বুর্জোয়ারাই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী ধর্মের মূল রক্ষক হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক এ প্রেক্ষাপটটি মজহার সাহেবের অজানা নয়। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার স্লোগানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে বুর্জোয়া শ্রেণী বেঈমানী করে শ্রমিক-কৃষকদের ক্ষমতার অংশীদার হতে বঞ্চিত করার জন্য সামন্তদের সাথে আবার আপোস করে। এই বুর্জোয়ারাই পরিণত বয়সে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে বিশে^র জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য ধর্মের লেবাসের আড়ালে দেশে দেশে তার দালাল শক্তি সৃষ্টি করেছে। হিন্দু, মুসলিম , বৌদ্ধ, খ্রিস্টান- সব ধর্মীয় লেবাসের আড়ালেই সাম্রাজ্যবাদ তার দালাল সৃষ্টি করছে। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ধর্মীয় লেবাসে শাসকগোষ্ঠী যেমন সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারী করছে, তেমনি হিন্দু ধর্মের লেবাসে ভারতের শাসকগোষ্ঠীও সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারী করছে। যেহেতু ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের পবিত্র বিশ্বাসের জায়গা রয়েছে, এটিকেই শাসক-শোষক গোষ্ঠী ব্যবহার করতে চায়। ফলে কমিউনিস্টরা রাজনীতিতে নিছক ধর্মের বিরোধিতা করে জনগণের স্পর্শকাতর বিষয়ে কখনোই আঘাত করে না। কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে শাসক-শোষক গোষ্ঠী জনগণের সাথে যে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করছে তার স্বরুপ উন্মোচন করাও কমিউনিস্টদের কর্তব্য। এ কাজটি করতে গেলে মজহার সাহেবের আপত্তি কোথায়? জামায়াতে ইসলাম বা এনসিপি- এরা কি সাম্রাজ্যবাদের দালাল রাজনৈতিক দল নয়? এরা কি ধর্মকে ব্যবহার করে জনগণকে প্রতারণা করছে না? তাহলে মজহার সাহেব কোন স্বার্থে জামায়াত, এনসিপি’কে আড়াল করতে চান? বিএনপি’র সাথে কি এদের কোন প্রকার শ্রেণীগত পার্থক্য রয়েছে? বিএনপি যেমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করছে, তেমনি জামায়াত-এনসিপি চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে কোথায়? এনসিপি সারাদেশ ভ্রমণের কোটি কোটি টাকা কোথায় পেয়েছে? জামায়াত ব্যাংক-বীমা ও প্রশাসনিক পদগুলো দখল করে নিরবে যে নির্মম চাঁদাবাজি ও লুটপাট করছে মজহার সাহেব কি পত্রিকার পাতায় তা দেখেন না? আসল কথা হলো বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি এদের মুখোশ উন্মোচন হয়ে গেলে উন্মোচন হয়ে যায় এদের প্রভুর মুখোশ। বুদ্ধিমান মজহার সাহেব এদের প্রভুর দীর্ঘদিনের পরিক্ষিত উকিল, এটা তার সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জানেন।
মজহার সাহেব তার নিবন্ধে বলেছেন-“পশ্চিমের গণতান্ত্রিক বিপ্লবে ধর্মের ইতিবাচক ব্যবহার এবং জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সাথে ধর্মীয় ভাষা ও নৈতিকতার নানান প্রকার সংযুক্তি ঘটেছে।” এ প্রেক্ষিতে তিনি ইংল্যান্ডের ‘পুরিটান বিপ্লব’ আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬), ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯), লাতিন আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি আন্দোলনের নজির তুলে ধরেন। এসব নজির তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ‘পশ্চিমের বিভিন্ন বিপ্লবে ধর্মীয় ইনসাফ বা ন্যায়ের ভাষা এবং ঈশ্বরের নামে নৈতিকতা জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে ইতিবাচক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।’ জনাব মজহার যে ইতিহাস বিকৃতিতে ওস্তাদ, এ বিষয়টি সম্পর্কে তার পরিচিত সর্বজনেরাই সম্ভব জ্ঞাত! ইতিহাসের গতিপথকে তিনি তার ইচ্ছামাফিক চালাতে চান। ভাগ্যিস! পৃথিবীর সেরা সেরা দার্শনিকরা বুর্জোয়া বিপ্লবের সময়ের ইতিহাস লিখে গিয়েছেন। নতুবা মজহার সাহেব তার মতো করে দুনিয়ার ইতিহাস লিখে তার শিষ্যদের গলাধ:করণ করাতেন। সামন্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুর্জোয়ারা অস্ত্র ধারণ করে উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন এনেছিল। এ সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে বলা হয়েছে- “উৎপাদনের উপায়ে অবিরাম বৈপ্লবিক বদল না এনে এবং তাতে করে উৎপাদন সম্পর্ক ও সেই সঙ্গে সমগ্র সমাজ সম্পর্কে বৈপ্লবিক বদল না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণী বাঁচতে পারে না।” যে সময়টাতে বুর্জোয়ারা সমস্ত সামন্তীয় চিহ্নগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পুঁজিবাদের দিকে ছুটছে তখন মজহারের ভাষায় তারা ঈশ্বরের নামে জনগণের মুক্তির লড়াই অগ্রসর করেছেন। মজহার যেসব আন্দোলনগুলির নজির তুলে ধরেছেন সেগুলো মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর আন্দোলন। ইউরোপের ইতিহাসে এই শতাব্দীকে মহত্তম শতাব্দী বলা হয়। এ শতাব্দী সম্পর্কে রোবসপিয়ের বলেন, “ প্রকৃতির অন্তর্লীন প্রতিশ্রতির পূর্ণতা, মানবজাতির ভাগ্যজয়, অপরাধ ও স্বৈরাচারের দীর্ঘ রাজত্ব থেকে নিয়তির মুক্তি এবং সর্বজনীন সুখের নতুন উষার আলোকের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি।” এ শতাব্দীতে বুদ্ধিবিভাসিত দার্শনিকদের জন্ম হয়। ‘ফরাসী বিপ্লব’ নামক পুস্তকে প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী উল্লেখ করেন- “ স্বীয় অধিকার সচেতন অষ্টাদশ শতকের মানুষ ঈশ্বর পারবশ্য স্বীকার করে নিতে রাজী ছিল না। মানুষের স্বধর্ম তার স্বাধীনতা, স্বীয় ভাগ্যজয়ের দৃঢ় সংকল্প। মানুষ ঈশ্বর শাসিত নয় কারণ বিজ্ঞানের অপ্রতিহত অগ্রগতির দ্বারা প্রকৃতির ঐশী শক্তির নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘিত।” এভাবে প্রথমে ইংল্যান্ডে ও পরে ফ্রান্সে বুর্জোয়া শ্রেণী বিশ্বজগৎ, সমাজ ও মানবিক অস্তিত্বের পারস্পরিকতা সম্পর্কে একটি নতুন ধারণা ক্রমশ গড়ে তোলে। অষ্টাদশ শতকের পঞ্চাশের দশকে দার্শনিকরা একটি সংগ্রামী গোষ্ঠীতে পরিণত হয় এবং ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য এরা বিশেষভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়। এরা সবাই বুর্জোয়া দার্শনিক ছিলেন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতা অধিকারের জন্য ঈশ্বর আরোপিত সীমাকে অস্বীকার করা ছাড়া বুর্জোয়া শ্রেণীর গত্যন্তর ছিল না। নিরীশ্বর হয়ে অথবা চার্চীয় ঈশ্বর বিরোধীতার দ্বারাই বুর্জোয়া শ্রেণী নতুন সমাজ সৃষ্টিতে ব্রতী হয়। দু:খজনক (!) বিষয় যে, সেদিন তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ণয়ের সময় ফরহাদ মজহারের পরামর্শ অনুযায়ী ধর্মের ব্যবহার করেন নি, বরং ধর্মকে অস্বীকার করেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে অগ্রসর হয়েছিলেন।
মজহার লেনিনের নাম উল্লেখ করে খুব চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শুধু বুর্জোয়া শ্রেণীর কথা থাকলেও এবং শ্রমিক শ্রেণীর কথা না থাকলেও তাকে খেটে খাওয়া জনগণকে সমর্থন করতে হবে।’ লেনিন এই কথাটি কোথায় কবে বলেছেন তার রেফারেন্স নেই। অর্থাৎ ফরহাদ সাহেব মনে করেছেন লেনিন এটা বলতে পারেন, তাই লেনিনের নাম বলে দিলেন। অথচ তিনি সুকৌশলে ইতিহাসের রক্তঝরা সংগ্রামকে আড়াল করে গেলেন। অষ্টাদশ শতকের বুর্জোয়া বিপ্লবের থেকে প্যারি কমিউন বা এর পরবর্তী বিপ্লবগুলি যে ইতিহাসে ভিন্ন নজির স্থাপন করেছে সে সম্পর্কে মজহার সাহেবের মনে হয় এখনো চেতন আসে নি। বুর্জোয়া বিপ্লব বা গণতান্ত্রিক বিপ্লবগুলিতে বুর্জোয়ারা নেতৃত্ব দেয়ার সময় শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষকের সাথে বেঈমানি করার ফলে পরবর্তীতে বুর্জোয়া বিপ্লবের নেতৃত্ব চলে যায় শ্রমিক শ্রেণীর হাতে। রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারীতে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব হয়, তার নেতৃত্ব কি বুর্জোয়ারা দিয়েছিল নাকি বলশেভিক পার্টি দিয়েছিল? মজহার সাহেব জুলাই আন্দোলনকে কোন রকমে যাতে বুর্জোয়া আন্দোলন হিসেবে চালাতে পারেন সেজন্য জনাব উমরকে অভিযুক্ত করছেন যে, “তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছেন। চব্বিশের গণভ্যুত্থান অবশ্যই সমাজতন্ত্র কায়েমের বিপ্লব না, এটা অবশ্যই গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান যাকে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে নস্যাৎ করা হয়েছে। যার দায় বামপন্থিদের ওপরও বর্তায়।” (হা, হা—–,) মজহার সাহেব যেভাবে জনাব উমরকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পার্থক্য বোঝাচ্ছেন, এটা জানার পর জনাব উমর না জানি কিরকম ভিমরি খেয়ে উঠেন! মজহার সাহেব এইভাবে রসিকতা করতে জানেন, আসলে জানা ছিল না! কিন্তু উনি যে মিথ্যাচার করেন ও বিভ্রান্তি তৈরি করেন তা স্পষ্ট হয়ে উঠে লেনিনের কোটেশনটি তার নিজের মত করে অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে। লেনিন ‘দুই কৌশল” (Two Tactics of Social Democracy in the Democratic Revolution) বইতে বলেছেন: `The democratic revolution is directed against the medieval order, against serfdom, against the absolute monarchy.” কোটেশনে লেনিন বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ভূমিদাসত্বের বিরুদ্ধে, নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।’ অথচ মজহার সাহেব তার মত করে অনুবাদ করেছেন- ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব ফ্যাসিস্ট ও শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধ্বংসের সংগ্রাম”। এই হচ্ছে মজহার সাহেবের মিথ্যাচারের স্বরুপ।
যাক, মজহার সাহেব আহত হয়েছেন উনার গণতান্ত্রিক বিপ্লবটি বেহাত হয়ে যাওয়ায়! এর জন্য তিনি দায়ী করছেন ‘বামপন্থিদের’। ভাগ্যিস! বামপন্থিদের কিছু অস্তিত্ব ছিল বলে মজহার সাহেব দোষ চাপানোর জন্য কাছাকাছি কারো পেলেন! কিন্তু তার কথিত বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে যে একচেটিয়া মার্কিন বুর্জোয়া শ্রেণীর আধিপত্য এদশে আরও প্রবল হয়েছে, এ কথাটি তিনি বগলের তলে রেখেছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অবস্থান এদেশে আরও অগ্রসর হয়েছে এটি কোনভাবেই তিনি প্রকাশ করতে রাজি নন। তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য স্বীকার করুন আর না করুন, তিনি যে মার্কিনের বিশ্বস্ত প্রহরী তা তিনি যথেচ্ছভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
(লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ)