উপ-সম্পাদকীয়

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা-মোঃ মাসুদ মিয়া

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটা রাষ্ট্রের গণমাধ্যম যতটা স্বাধীন, সেই দেশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তত বেশি, অর্থনীতি তত শক্তিশালী। গণমাধ্যম জনগণের কথা তুলে ধরে, সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তোলে লেখনির মাধ্যমে। সরকারের সাথে সাধারণ জনগণের যোগাযোগ মাধ্যম এই গণমাধ্যম।  বলা হয়ে থাকে গণমাধ্যম যত শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি তত মজবুত। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার যুগে বর্তমানে তথ্যের অবাধ সরবরাহ মানুষের কাছে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেইসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, মেসেঞ্জার, লিংকড ইন, স্কাইপি, ভাইবার ইত্যাদি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মুহুর্তের মধ্যেই যেকোনো খবর ভাইরাল।  এক সার্ভেতে দেখা যায়, দেশের তরুণদের ৮১ শতাংশ ফেইসবুক ব্যবহার করে। তবে জনমত তৈরির পাশাপাশি গুজব ও অপতথ্য প্রচারের ফলে অনেক সময় জনরোষ তৈরি হয়। সবগুলো গণমাধ্যমেরই ২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছিল অনন্য ভূমিকা। মূলত গণমাধ্যমের কল্যাণেই চাকরির পরীক্ষায় কোটা নাকি মেধা ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার থেকে শুরু হওয়া এ গণআন্দোলনটি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৮ সালের এক পরিপত্র অনুযায়ী সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা প্রয়োগ বাতিল করেছিল। ফলে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (বিপিএসসি) কর্তৃক গৃহীত ৪০তম, ৪১তম এবং ৪৩তম বিসিএস ছিল কোটামুক্ত শতভাগ মেধায় নিয়োগ। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সংগঠন সেই পরিপত্রের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন করলে আদালত ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে, ফলে কোটা প্রয়োগের রাস্তা আবারও উন্মুক্ত হয়। এতে সচেতন সাধারণ চাকরি-প্রত্যাশীরা সেই রায়ের বিরুদ্ধে মানববন্ধন, অনশন, তৎকালীন সরকারকে স্মারকলিপি প্রদান করে হাইকোর্টের রায়কে তুলে দিয়ে কোটামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। কিন্তু তৎকালীন  সরকার সেটা তো করেই নি, বরং উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ক্রমে ক্রমে ঢাকার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং  ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন ডালপালা মেলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল এই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার। ছাত্ররা যখন বুঝতে পারল শান্তিপূর্ণ উপায়ে এ দাবি আদায় তৎকালীন সরকার মেনে নিবে না, তখন তারা সারাদেশব্যাপী প্রোগ্রাম ও আন্দোলনের ডাক দেয়। সারাদেশে একযোগে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের নির্দেশনা অনুসারে শান্তিপূর্ণ হরতাল, অবরোধ, মিছিল, স্লোগান চলতে থাকে। মিডিয়া কভারেজ পাওয়ায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের ফলে আন্দোলনটি সহজেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর হঠাৎ পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ রংপুরের আবু সাঈদ, আন্দোলনের তেজ আরও বেগবান হলো এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের নিখোঁজ হওয়া, মৌলিক অধিকার ইন্টারনেট সারাদেশে বন্ধ রাখা সাধারণ জনগণকে বিরাগভাজন করেছিল। ফলে সাধারণ জনগণের বিপুল সমর্থন থাকায় সমন্বয়করা যা নির্দেশ দিতেন, তা পালনে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণ সহায়তা করেছে। সরকার কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে যখন ধরেই নিয়েছিল আন্দোলন এবার স্তিমিত হবে, তখনই ঢাল হয়ে মাঠে নামে ধনীর আদরের দুলাল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সমন্বয়করা সারাদিনের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করে সন্ধ্যায় বা রাতে সংবাদ সম্মেলন, প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতেন সারাদেশের উদ্দেশ্যে। এখনো কানে বাজে মুগ্ধর সেই সংলাপ, এই পানি লাগবে? পানি? আন্দোলনে ছাত্রদের পানি পিপাসা মিটাতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন মীর মুগ্ধ। এই সংবাদগুলো মুহূর্তের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল শুধুমাত্র গণমাধ্যমের কল্যাণে। কমপ্লিট শাটডাউন, বাংলা ব্লকেড ইত্যাদি ইউনিক প্রোগ্রামগুলো দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সফলভাবে পালিত হয়, তবুও তৎকালীন সরকার কোটা বাতিলের বিষয়ে কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত দেয় নি। ফলে সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে আন্দোলনের সাথে একাত্ততা প্রকাশ করে এবং সমন্বয়করা প্রথমে ০৯ দফা ঘোষণা করে, পরবর্তীতে যা একদফায় রুপান্তরিত হয়ে সরকার পতনের ডাক দেয়। ০৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়া হয় ০৬ আগস্টে সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষের ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিন্তু সরকারের ১৪৪ ধারা জারি ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতে ঘোষণা দেন, পরশু নয়, আগামীকালই মার্চ ফর ঢাকা। প্রকৃতপক্ষে দেশের সবাই এরকম একটা নির্দেশনা চেয়েছিল। ফলে ০৫ই আগস্ট দিনব্যাপী নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রদের নেতৃত্বে তৎকালীন সরকার পতন হয় এবং বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

জুলাই ২৪ গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের অনেক বেশি অবদান ছিল। যে অবদানের কথা কখনো দেশের মানুষ ভুলতে পারবে না। কারণ সাংবাদিকদের দেখা সঠিক তথ্য ও লেখনি গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হওয়ার কারণে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন এলাকার খেটে খাওয়া মানুষসহ নানান পেশার সাধারণ মানুষ বিগত সরকার এবং তাদের দোসরদের সরাতে জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আবু সাঈদ ও মুগ্ধসহ শহীদদের কারণে সারাদেশব্যাপী জনগণের আস্থা হারিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে তৎকালীন সরকার। তবে ওই সময় কিছু সাংবাদিক ও গণমাধ্যম দোসরীপনায় লিপ্ত হয়ে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে প্রকাশ্যে দালালি করে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। তাদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সরকারের চাপে কিছু মিডিয়া যখন সংবাদ প্রচার করতেছিল না, তখন সোশ্যাল মিডিয়া সেই গ্যাপ পূরণ করেছে। তবে এখনো সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা মূলধারার সংবাদ মাধ্যম। কারণ, মূল্ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারের আইন-বিধিমালা মেনে চলে এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। যদিও হলুদ সাংবাদিকতা বলে একটা টার্ম রয়েছে। যদি কোনো সাংবাদিক মূল ঘটনাকে ফোকাস না করে রং-চং মিশিয়ে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে সংবাদ পরিবেশন করে তখন তাকে হলুদ সাংবাদিকতা বলে। আমাদের এই হলুদ সাংবাদিকতা থেকে সচেতন থাকতে হবে। বর্তমানের আরেকটি আতঙ্ক হচ্ছে গুজব ও অপপ্রচার। মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যা বলে প্রচুর অপতথ্য শেয়ার হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই সাংবাদিকদের গুজব থেকে সাবধান থাকতে হবে এবং কারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সজাগ হতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো তথ্য এলে সেই বিষয়টি যাচাই করে তারপর সেই সংবাদটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ম্লান করতে একটি মহল এখনো গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন মহলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

গণমাধ্যম যাতে অধিকতর স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য
গত মার্চে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাদের সংস্কার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে৷ এ সময় কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ‘‘কীভাবে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেটাও আমরা দেখিয়ে দিয়েছি৷ এখন সরকারের দায়িত্ব এটা বাস্তবায়ন করার৷ কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, যেগুলো এখনই করা সম্ভব, তা সরকার দ্রুত করে ফেলবে৷” সাংবাদিক কামাল আহমেদের নেতৃত্বাধীন এ সংস্কার কমিশনের কাজকে অমূল্য হিসেবে তুলে ধরে মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রতিবেদন যেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য মানুষ পড়তে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন৷

 লেখকঃ- তথ্য অফিসার (৪১তম বিসিএস), আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।