উপ-সম্পাদকীয়জাতীয়

প্রত্যেক উপজেলা শহরে সংবাদপত্র বিতরণ ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হোক

প্রত্যেক উপজেলা শহরে সংবাদপত্র বিতরণ ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হোক
বাংলাদেশের গণমাধ্যমখাত গত দুই দশকে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিস্তৃত হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যপ্রবাহকে আরও দ্রুত করছে। তবুও একটি মৌলিক সত্য আজও অটুট রয়েছে। মুদ্রিত সংবাদপত্র এখনো দেশের তথ্যপ্রবাহ, মতামত আদানপ্রদান, গণমানুষের সচেতনতা এবং সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বাইরে, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে সংবাদপত্র বিতরণ ও বিক্রয়কেন্দ্রের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রকৃত পাঠক বঞ্চিত হচ্ছে, স্থানীয় তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম কাঠামোতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা শহরকে বলা হয় গ্রামের মানুষের প্রথম নগর সংযোগ। এখানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসাবাণিজ্য, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু গড়ে ওঠে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ উপজেলা শহরে আসে নানা প্রয়োজনে। কিন্তু তাদের হাতে সহজে সংবাদপত্র পৌঁছায় না। যেসব পাঠক সংবাদপত্র সংগ্রহ করতে চান, তাদের অনেক সময় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার অনেক উপজেলায় স্থানীয়ভাবে কোনো কিওস্ক, এজেন্সি বা বিক্রয়কেন্দ্রই নেই। পরিবহনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সকালে ছাপা হওয়া পত্রিকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যায়। তখন সংবাদপত্রের তাৎক্ষণিক সংবাদমূল্য হারিয়ে যায়।
এর পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক তথ্যের বিশৃঙ্খলায়। অনেক মানুষ ফেসবুকের ভুঁইফোড় নিউজ পেজ, যাচাইবিহীন ভিডিও কনটেন্ট বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচালিত প্রচারণাকে সংবাদ মনে করে বিভ্রান্ত হয়। ভূয়া ফেসবুক পেইজ সহ নানান ভুঁইফোড় এর বেড়াজালে আসল ও মূলধারার গণমাধ্যম বা পত্রিকা গুলো সম্পর্কে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেনা। কোনটি বিশ্বাসযোগ্য, কোনটি যাচাই করা তথ্য, আর কোনটি গুজব তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব এড়াতে সংবাদপত্র বিতরণ কেন্দ্র স্থাপনের বিকল্প নেই। একটি নির্ভরযোগ্য বিক্রয়কেন্দ্রে পাঠক নিশ্চিতভাবে আসল জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা সংগ্রহ করতে পারবে। তাই উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী বিতরণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।
সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ প্রকাশের বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, জনগণকে তথ্যসচেতন করা, মতামত গঠন, সমাজে যুক্তি ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখার মাধ্যম। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে সংবাদপত্র না পৌঁছানো মানে এই জনগোষ্ঠীকে তথ্যপ্রবাহ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ জনগণের। তারা স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্প, স্বাস্থ্য বা শিক্ষা খাতের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে পারে না। তারা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সঠিক ও যাচাই করা তথ্য পায় না। মানুষ তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবনির্ভর পরিবেশে ঝুঁকে পড়ে, যা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি উপজেলা শহরে যদি সংগঠিত সংবাদপত্র বিক্রয়কেন্দ্র থাকে, তাহলে পাঠক সহজে সংবাদপত্র পাবে, সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা বাড়বে এবং পাঠাভ্যাস উন্নত হবে। এখানে প্রতিদিনের জাতীয় পত্রিকার পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদপত্রও বিক্রি হতে পারবে। স্থানীয় সংবাদপত্রের টিকে থাকার একটি বড় ভিত্তি হলো উপজেলা ও গ্রামীণ পাঠক। কিন্তু বিতরণব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হারাচ্ছে। ফলে স্থানীয় সাংবাদিকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে, সংবাদ সংগ্রহ ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হচ্ছে এবং মানসম্মত স্থানীয় সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়ছে।
উপজেলা পর্যায়ে সংবাদপত্রের স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, জ্ঞান বিস্তার এবং গণতান্ত্রিক চর্চা। একটি সভ্য ও সচেতন সমাজ পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যেখানে সংবাদপত্র থাকে, সেখানে আলোচনা তৈরি হয়, মতামত বিকাশ পায় এবং নতুন প্রজন্ম যুক্তির চর্চা শেখে। অনেক সময় আমরা দেখি উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি বা সাধারণ জ্ঞান উন্নত করতে পত্রিকার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সহজে পত্রিকা না পাওয়ায় তারা বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি নির্ভরযোগ্য বিক্রয়কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদপত্র বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতার আরেকটি দিক হলো লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা। পরিবহনব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় পত্রিকা পরিবেশনে বিলম্ব ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেলা শহরের কোনো হকার বা ছোট এজেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়, যার নিজস্ব কোনো স্থায়ী স্থান বা বিক্রয়কেন্দ্র নেই।থাকলেও তা সার্বক্ষণিক বা নির্দিষ্ট সময় নিয়ে খোলা থাকেনা। ফলে পাঠকের কাছে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক উপজেলায় সংবাদপত্র বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্ট নেই, ফলে হকাররা ইচ্ছেমতো সময় ও স্থানে পত্রিকা বিক্রি করে। এই অস্থিরতা পাঠককে নিরুৎসাহিত করে।
একটি সংগঠিত বিক্রয় ও বিতরণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সংবাদপত্র মালিক, পরিবেশক এবং সাংবাদিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, পৌরসভা মার্কেট বা ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে ছোট খরচে কিওস্ক নির্মাণ কিংবা লাইসেন্স প্রদান করা যেতে পারে। সংবাদপত্র পরিবেশকদের জন্য সহজ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে প্রতিটি উপজেলা শহরে ন্যূনতম একটি কেন্দ্রীভূত বিতরণস্থল গড়ে তোলা সম্ভব।
উপজেলা পর্যায়ে সংবাদপত্র বিতরণকেন্দ্র শুধু পত্রিকা বিক্রির স্থান নয়। এটি তথ্য বিনিময়ের কেন্দ্র, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক চেতনাকে শক্তিশালী করার কেন্দ্র এবং সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তোলার স্থান হতে পারে। ভবিষ্যতে এখানে অনলাইন সংবাদপত্রের প্রিন্ট সংস্করণের ডেলিভারি, ম্যাগাজিন বিক্রি, বই বিতরণ বা পাঠাগারসদৃশ সেবা যুক্ত করার সুযোগও রয়েছে।
সংবাদপত্র শিল্প আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বিজ্ঞাপন কমে গেছে, খরচ বেড়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এই অবস্থায় নতুন পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করা এবং বিদ্যমান পাঠকদের ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা শহরগুলো সেই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। তাই এখনই সময় পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের। প্রতিটি উপজেলা শহরে সংবাদপত্র বিতরণ ও বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা কেবল প্রয়োজনই নয়, সময়ের দাবি।
একটি সচেতন, জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং যুক্তিবোধসম্পন্ন সমাজ গড়তে হলে তথ্যপ্রবাহকে শক্তিশালী করতে হবে। আর সেই তথ্যপ্রবাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মুদ্রিত সংবাদপত্রকে প্রতিটি মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী সংবাদপত্র বিক্রয় ও বিতরণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হলে দেশব্যাপী সাংবাদিকতা আরও প্রাণবন্ত হবে, পাঠাভ্যাস বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা আরও সুদৃঢ় হবে।
রাইসুল ইসলাম রিফাত,
শিক্ষার্থী, আনন্দমোহন কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়