উপ-সম্পাদকীয়

বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয়দের দ্বন্দ্ব: সংকটের দীর্ঘ ছায়া

গতরাতের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বছরের অন্যান্য সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংঘর্ষ ঘটে। শুধু গ্রামবাসী নয়, কখনো কখনো এই সংঘর্ষ ব্যবসায়ী কিংবা পরিবহন সেক্টরের লোকদের সাথেও হয়। এতে উভয়পক্ষেই আহত-নিহত পর্যন্ত ঘটে এবং দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়। সাধারণত এসব দ্বন্দ্বের বিচারে শিক্ষার্থীদের নিরীহ বা বেগুনাহ ধরে সালিশ-বৈঠক, মামলা-মীমাংসা সম্পন্ন হয়। ফলে সমস্যার মূলোৎপাটন হয় না, বরং সমস্যা থেকেই যায়। গতরাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইকিং করে সংঘর্ষে উভয় পক্ষে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষ—ভাবা যায়! এই সংঘর্ষের রেশ এখানে থামছে না; বরং অতীত স্মৃতি বলছে—জল আরও ঘোলা হবে। অথচ খোঁজ নিলে জানা যায়, অতীতের সব ঘটনা নারী শিক্ষার্থীকে উত্যক্ত করা, নেশাজাতীয় দ্রব্যের লেনদেন কিংবা সামান্য কোনো বিষয়ে কথা-কাটাকাটির মতো তুচ্ছ বিষয়কে ঘিরেই ঘটেছে।

যে জনপদে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, সে জনপদের ভাগ্য খুলে যায়। সেখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হয়। ব্যবসার নানা দ্বার উন্মোচিত হয় এবং মানুষ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর শিক্ষা নামক মৌলিক মানবিক অধিকার তাদের দ্বারের কাছেই এসে দাঁড়ায়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তার সব শিক্ষার্থীকে হলে রাখার সক্ষমতা রাখে না। তাই আশেপাশে অসংখ্য মেস, হোটেল-রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠে। কৃষক থেকে মজুর, ধোপা থেকে নাপিত—সবাই উপকৃত হয়। মোটকথা, চারদিকে একটা রমরমা পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যেন রোজ মেলা বসে। বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তাও কমে যায়, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অল্প টিউশনের বিনিময়ে তাদের সন্তানের শিক্ষায় সহযোগিতা করে। এলাকাবাসী কি এসব অবদান গুনে দেখে? দেশের নানা প্রান্ত থেকে চার-পাঁচ বছরের জন্য আগত মেহমানদের তারা কেমন চোখে দেখে? অথচ তাদের কৃতজ্ঞ থাকার কথা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। পাহাড়-নদী আর অরণ্যে ঘেরা দেশের সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাসে যে শান্তি বিরাজিত থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার অভাব স্পষ্ট। রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দল, স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা এবং “আমি স্থানীয়” ও “আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী”—এমন বিভাজন বারবার বিষিয়ে তুলেছে পরিবেশকে। শিক্ষার্থীদেরও দোষ হতে পারে, অন্যায়ও করতে পারে—এই বোধ অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। বরং একজনের ভুলকে আড়াল করতে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে, আর সেখান থেকেই ঘটে রক্তারক্তির ঘটনা। শুধু চুয়েট নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ছবি দেখা যায়। এমনকি ক্যাম্পাসের বাইরে প্রেম করতে গিয়ে প্রেমিকা উত্যক্তের শিকার হলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় গ্রামে হামলে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার ঘাটতি জাতীয় বিপদের পথ প্রশস্ত করছে। আমরা যেন শান্তিতে থাকতেই চাই না।

দেশের অন্যতম বৃহত্তম আকৃতি-প্রকৃতির (২৩১২.৩২ একর) চবির ক্যাম্পাস মূলত পাহাড়ি গ্রামবাংলার অনন্য বৈচিত্র্যময়তায় ভরপুর। সেখানে শিক্ষার্থীদের মতোই স্থানীয়দের অবাধ ও অগাধ বিচরণ। গতরাতের ঘটনাটি ঘটেছে রাত ১১টার দিকে। এক ছাত্রী হলে ফিরছিল, অথচ দারোয়ান গেট খুলতে দেরি করছে বা এতরাতে গেইট খুলবে না বলেছে—এই নিয়ে ফ্যাসাদের শুরু। কেউ নিয়ম মানছে না, আবার কেউ মানবিকতা দেখাচ্ছে না। আজকাল কোনো ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই করাও কঠিন। সামান্য বিষয়কেও এমনভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়, যে সেখানে সত্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। দারোয়ানের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে স্থানীয়দের আসার প্রয়োজন নেই; বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চয়ই আছে। সেই ছাত্রীর কাছে পর প্রক্টরসহ অন্যান্য অথরিটির ফোন নম্বর থাকার কথা। অথচ সামান্য ঘটনায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মব তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থী কিংবা স্থানীয়—যেই হোক না কেন, উত্তেজনা কখনো সুফল আনে না, বরং সর্বদাই ক্ষতি ডেকে আনে। স্থানীয়দের মধ্যেও অহং কাজ করে, যা অত্যন্ত অন্যায়। তারা মনে করে, তারা ল্যান্ডলর্ড, সবকিছু তাদের ইচ্ছামতো চলবে। এই ইগো প্রবলেম বহু সমস্যার সূত্রপাত করেছে। অনেক সোজাসাপ্টা কথাকেও তারা বাঁকা করে উপস্থাপন করে। অথচ অধিকাংশ স্থানীয়ের জীবিকার মূল উৎসই বিশ্ববিদ্যালয়-ঘিরে তৈরি অর্থনীতি—এটা তারা ভুলে যায়। এটি অকৃতজ্ঞতারই প্রমাণ। একটি জনপদে বিশ্ববিদ্যালয় মানে সেই এলাকার মানুষের ভাগ্যের উন্মোচন।

চুয়েটের আরেকটি বড় সমস্যা মাদক। অবাধে ও প্রকাশ্যে সেখানে মাদকের কারবার চলে। ক্রেতা ও বিক্রেতা কারা তা অনেকেই জানে। শিক্ষার্থীদের উগ্র মনোভাব এবং ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা অনেক তুচ্ছ ঘটনাকে বড় বিস্ফোরণে পরিণত করে। একশো মানুষের মধ্যে কেউ যুক্তিবাদী, কেউ মানবিক, আবার কেউ ভুল বোঝে। মানসিকভাবে শতভাগ সুস্থ কোথাও নেই—না শিক্ষার্থীদের মধ্যে, না সাধারণদের মধ্যে। তাই কোন কথায়, কোন পথে ঝগড়া বাঁধতে পারে—এই বোধ উভয় পক্ষের থাকা দরকার। শিক্ষার্থীদের ড্যাম কেয়ার ভাব দেখানো মানায় না, আবার স্থানীয়দের সন্ত্রাসী আচরণও গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন নাজুক, তখন অসংযম ও বাড়াবাড়ি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ধৈর্য ও সংযমই এ জাতীয় সমস্যার একমাত্র সমাধান।

দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে, সবই কোনো না কোনো লোকালয়ে অবস্থিত। তবে কেন বারবার চুয়েট ঘিরেই এমন সংঘর্ষ হয়? অন্যান্য স্থানের তুলনায় চুয়েটসংলগ্ন এলাকায় অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা বেশি কেন? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও এলাকা সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেটা ক্ষতিয়ে দেখা দরকার। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম কিংবা দুর্নাম যেমন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বহন করে, তেমনি স্থানীয়দের ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতারও প্রতিফলন ঘটে। এই মনোরম ক্যাম্পাস দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আদর্শ হতে পারত। কিন্তু মারামারি করে কেউ বড় হয় না। যদি তাই হতো, কুস্তিগীররাই সমাজ-রাষ্ট্রের নায়ক থাকত। ঝগড়া বা সন্ত্রাস করে কেউ টিকে থাকতে পারে না; নইলে বহু প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেত।

মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বন্ধুত্ব স্থাপন ও শান্তি বজায় রাখার মধ্যে। মারামারি, হামলা-মামলা কিংবা হানাহানি মানুষের সুস্থ অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই অরাজকতার জবাবও হোক বন্ধুত্ব। দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাস নিরাপদ থাকুক, স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের আশীর্বাদ মনে করুক, শিক্ষার্থীরাও স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয় ভাবুক। ক্যাম্পাসের চারপাশে গড়ে উঠুক বন্ধুত্ব ও বন্ধনের পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনে চাই সভ্যতার সংস্কৃতি—সংকটের নয়।

রাজু আহমেদ, কলাম লেখক।
raju69alive@gmail.com