নির্বাচনে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন নারী, প্রবাসী ও তরুণ ভোটাররা -মোঃ মাসুদ মিয়া
নির্বাচনে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন নারী, প্রবাসী ও তরুণ ভোটাররা
-মোঃ মাসুদ মিয়া
১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন । উৎসবের মতো ভোটের আমেজ বিরাজ করছে চারিদিকে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা সভা, সেমিনার, জনসংযোগ করে এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। শহর থেকে গ্রাম, পাড়া-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান- সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই, কে হবে জনগণের প্রতিনিধি? কার হাতে যাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব? কি কি বিষয় জয়- পরাজয়ের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে? নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং আর প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো দেশ। ভোটকে ঘিরে এই উৎসবমুখর পরিবেশ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই তুলে ধরে। দীর্ঘ পথচলার পর আজ বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভোটের অঙ্ক শুধু সংখ্যার হিসাব নয়- বরং সামাজিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নারী, প্রবাসী ও তরুণ ভোটাররা জয়- পরাজয়ের মূল নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
নারী ভোটার: নীরব শক্তির জাগরণ
বাংলাদেশের বহু গ্রামে একসময় নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কোথাও কোথাও আজও নারীরা ভোট দিলেও কাকে দেবেন, সেই সিদ্ধান্তটি নিজের নয়- পরিবারের পুরুষ সদস্য বা মুরব্বিদের দ্বারা নির্ধারিত। এই বাস্তবতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায়। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ। এই বিশাল সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। যেকোনো প্রার্থীর জয়ের জন্য নারী ভোটারদের সমর্থন এখন অপরিহার্য। এই বিশাল সংখ্যাই বলে দেয়, নারীদের সমর্থন ছাড়া কোনো প্রার্থীর বিজয় সম্ভব নয়। নারীরা শুধু ভোটার নন; তারা সমাজ ও অর্থনীতির অদৃশ্য স্তম্ভ। গ্রামাঞ্চলে ৮৪ শতাংশ এবং শহরে ৫৯ শতাংশ নারী অবৈতনিক গৃহকর্মে নিয়োজিত। তারা পুরুষের তুলনায় সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘণ্টা বেশি কাজ করলেও সেই শ্রমের অর্থমূল্য জাতীয় আয়ের হিসাবে আসে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও নারীরা এখনও বৈষম্যের শিকার। এই বাস্তবতায় নারী ভোটারদের সামনে সময় এসেছে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে গিয়ে, যিনি সমাজ, নারী অধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করবেন- ভোটটি হওয়া উচিত তার পক্ষেই। একটি সচেতন নারী ভোটই বদলে দিতে পারে একটি আসনের, এমনকি দেশের রাজনৈতিক চিত্র।
প্রবাসী ভোটার: ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে বিশ্বের নানা প্রান্তে থাকা বাংলাদেশিরা সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ ভোটদান সম্পন্ন করেছেন। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার ও ওমান- এই দেশগুলোতে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শুধু নিজের ভোটই নয়, প্রবাসীরা দেশে থাকা পরিবার ও স্বজনদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছেন। প্রবাসী ভোটের এই অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যাগত নয়; এটি একটি প্রতীকী অর্জনও। এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র নাগরিককে ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে না। গণতন্ত্রের এই সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও নীতিনির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এবার সেই প্রবাসীরা সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছেন। ফলে প্রবাসী ভোটারদের মতামত একটি দ্বৈত প্রভাব তৈরি করছে- প্রত্যক্ষ ভোট এবং পরোক্ষ সামাজিক প্রভাব। বিশেষ করে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার ও ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ সংখ্যার দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব কম হলে এই প্রবাসী ভোটই হয়ে উঠতে পারে নির্ণায়ক।
তরুণ ভোটার: ট্রাম্প কার্ড
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভোটব্যাংক তরুণরা। মোট ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন না হওয়ায়, কয়েক কোটি তরুণ এবারই প্রথম প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়েছে। তরুণদের চাওয়া খুব স্পষ্ট—কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, দলীয়করণমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দেখতে চায়। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, মানবাধিকার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়েও তরুণ ভোটাররা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। শহরাঞ্চলে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের পছন্দই অনেক আসনে ফল নির্ধারণ করবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। দলগুলোও তাই প্রচারণায় তরুণদের ভাষায় কথা বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রশ্ন
নারী, প্রবাসী ও তরুণ- এই তিন শ্রেণির ভোটার মিলেই এবারের নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি। এরা কেউই আর প্রান্তিক নয়; সংখ্যায়, সচেতনতায় ও প্রভাবের দিক থেকে তারা কেন্দ্রীয় অবস্থানে। তারা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যারা শুধু স্বপ্ন দেখাবে না, বাস্তবায়নের সদিচ্ছা ও সক্ষমতাও রাখবে; যারা বৈষম্যহীন সমাজ, মানবাধিকার, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নেবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ভোটের দিন নয়- এটি বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রের উৎসব, সচেতন নাগরিকত্বের বিজয়। এই নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে নারী, প্রবাসী ও তরুণ ভোটারদের রায়ই গড়ে দেবে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ঘরে বসে না থেকে নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে আসুন, আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন এবং দেশ গঠনে অংশ নিন। মনে রাখবেন, বুলেটের চেয়ে ব্যালট শক্তিশালী, যার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে।
লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

