অর্থনীতিজাতীয়

এলএনজি দিয়ে গ্যাসের ঘাটতি পূরণের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে

অর্থনৈতিক ডেস্ক: আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করা হচ্ছিল মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) দিয়ে। এর মধ্যে ৫০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার একটি এফএসআরইউ এখন বন্ধ রয়েছে। মুরিং পয়েন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ চালু হতে সময় লেগে যাতে পারে আরো দেড় মাস। এর মধ্যে আবার কাতার ও ওমান জানিয়েছে, আগামী বছর এলএনজির সরবরাহ কমিয়ে দেবে দেশ দুটি।

দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৯০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি থাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে গ্যাসভিত্তিক অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ অবস্থার মধ্যে গ্যাসের সংকট আরো প্রকট হলে আগামীতে বেশকিছু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে বলেও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। সেক্ষেত্রে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া আর কোনো গতি নেই বলে মনে করছেন তারা। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য যদি

প্রত্যাশিত পর্যায়ে না নেমে আসে তাহলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঝুঁকি

আরো বেড়ে যাবে। বিপাকে পড়তে পারে দেশের শিল্প খাতও। বিশেষ করে ক্যাপটিভ বিদ্যুিনর্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

জ্বালানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা এবং গ্যাস সরবরাহে শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী কোনো চ্যানেল তৈরি করতে না পারায় এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাছাড়া সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারার বিষয়টিও এ বিড়ম্বনাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এসব সংকট মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কোনো সদুত্তরও মিলছে না জ্বালানি বিভাগ বা পেট্রোবাংলার কাছ থেকে।

যদিও নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এলএনজি নিয়ে আসন্ন এসব সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে এখন জ্বালানি তেলের বাজার ও এলএনজির স্পট মূল্যের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত এগিয়েছে অনেকটা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। অনেক আগেই জ্বালানি পণ্যটির মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে খাত দুটিতে বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির পথ সুগম করার সুপারিশ করেছেন তারা। কিন্তু গত এক দশকে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অন্যান্য খাত এগোলেও জ্বালানি খাত এগোয়নি। বিশেষত এখনো গ্যাসের নিশ্চিত সরবরাহের সংস্থান করা যায়নি। যদিও দেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্প খাতের প্রসারের পরিকল্পনাগুলো সাজানো হয়েছে গ্যাসের আমদানিনির্ভর সরবরাহকে কেন্দ্র করে। আবার এ আমদানিনির্ভরতার ক্ষেত্রেও উৎস নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি বড় চুক্তির উদ্যোগের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত ঘাটতিই থেকে গিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানি জ্বালানি দিয়ে কখনো পরিকল্পনা করা উচিত নয়। কারণ এ ধরনের পণ্যের দাম কখনো স্থিতিশীল নয়। বিশেষত আমরা এলএনজি নিয়ে যেসব পরিকল্পনা করেছিলাম তা কিন্তু কাজে লাগছে না এবং এটি আমরা অনেক আগ থেকেই বলে আসছি। নিজস্ব সক্ষমতার বাইরে যতটুকু আমদানি না করলে নয় ততটুকুই করা উচিত। কারণ অর্থনীতি, শিল্প খাত যার ওপর দাঁড়িয়ে তার একটা শক্ত অবস্থান থাকা দরকার।

গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭-এ দেশে গ্যাসের মজুদ সংকট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানির কথা বলা হয়েছিল। এজন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় দেশে ৬০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদার মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ আমদানীকৃত এলএনজির মাধ্যমে পূরণের প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারের কভিড-পরবর্তী জ্বালানি পরিস্থিতি অনুযায়ী, এ প্রক্ষেপণও পূরণ হচ্ছে না।

দেশে বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার বাইরে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে। আমদানিনির্ভর এ পণ্যের ওপর ভরসা করেই দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব খাতে যে হারে গ্যাসের প্রয়োজন হবে, সে অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণ করা যায়নি। কয়েক বছর ধরে সরকার এলএনজি আমদানির কথা বলছে, কিন্তু এখনো ৪ মিলিয়ন টনের বেশি দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি করা যায়নি।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ম তামিম বলেন, দেশের সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে গ্যাস নিয়ে আমরা কখনো টেকসই পরিকল্পনায় যেতে পারিনি। সংকট মোকাবেলায় আমরা আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দামে যে উত্থান-পতন, সেগুলো ভালোভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কোনো পণ্য কিনতে হলে মার্কেট পালস বোঝা দরকার। এসব বিষয়ে দক্ষ জনবলেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি আমরা সে সময় করতে পারিনি। নিয়মতান্ত্রিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় আজকে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।

আগামী বছরে বেশ কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। বিশেষত সামিট রিলায়েন্স ও ইউনিক গ্রুপের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস সরবরাহের চুক্তি করলেও এ চুক্তি অনুযায়ী কীভাবে জ্বালানি পণ্যটির সরবরাহ করা হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারের অগ্রাধিকার প্রধানতম। মূলত দেশের বিদ্যুৎ, শিল্পসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠার উৎপাদন ঠিক রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। তবে এ মুহূর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করছি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে যাতে আমরা গ্যাস পেতে পারি।

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *