অন্যান্য

“পুলাডার মোবাইলে আসক্তি কমেছে, অহন খাওয়ার রুচিও বাড়ছে’ 

হাকিম বাবুল : ‘বাড়ীতে থাকলে মোবাইল ফোন দেখতো, ঠিকমতো খাবার খাইতো না, অনেক কাওছালি কইরা (কৌশল করে) খাওয়ান লাগতো। বাড়ীতে পুষ্কুরনি (পুকুর) আছে, আমরাও কাম-কাইজে ব্যস্ত থাহি। অসাবধানতায় পুস্কুরনির মধ্যে পানিতে পড়তে পারতো। এই সেন্টারডা অওনে খুব বালা অইছে (ভাল হয়েছে)। পুলাডারে (ছেলে) নিয়া কোন টেনশন নাই। এইহানে সেন্টারে নিরাপদে থাহে। লেহাপড়াও (লেখাপড়াও) শিখছে। ছড়া-গান, আকাআকি শিখছে, খেলাধুলা করতাছে। সেন্টারে আওনের (আসার) পর থাইক্কা (থেকে) পুলাডার মোবাইলে আসক্তি কমেছে, অহন খাওয়ার রুচিও বাড়ছে।’ নিজের সাড়ে ৪ বছরের ছেলে আবু রায়হানকে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন গৃহবধু রেহানা খাতুন (৩০)। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ঝাউয়েরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এই গৃহবধুর ছেলেটি গত এক বছর যাবত নিয়মিত যাতায়াত করছে বাড়ীর নিকটবর্তী ‘ধানীখোলা শিশুযতœ কেন্দ্রে’। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রতিদিন ওই শিশুযতœ কেন্দ্রে শিশু আবু রায়হান সমন্বয়কারী নাজমিন নাহার ও সহকারি মারজিয়া আক্তার আঁখির তত্বাবধানে থাকছেন। সেখানে শিশুরা ইচ্ছামতো নানা ধরনের গান-গল্প, ছাড়া, খেলাধুলা, আঁকাআকির মধ্য দিয়ে আনন্দময় সময় পার করছে। যাতে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ঘটছে, হচ্ছে মানসিক উন্নয়ন। নিশ্চিত হচ্ছে শিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা।
গৃহবধু রেহানার খাতুনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার স্বামী  মিন্টু মিয়া একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পাশের বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান রয়েছে। প্রায় ১১ বছর আগে এক বছর তিন মাস বয়সী তাদের প্রথম সন্তান সাব্বির রিফাত বাড়ীর পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায়। সেদিন দুপুর ১টার দিকে বিদেশ থেকে তার ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) ফোন দিয়েছে। ফোনে কথা বলে তিনি ছেলেকে শ্বাশুড়ির নিকট রেখে রান্নাঘরে যান মাছ কাটাতে। শ্বাশুড়ি প্রবাসী ছেলের তার ফোনে কথা বলার জন্য কোল থেকে নাতি সাব্বির রিফাতকে তুলে দেন ননদের হাতে। ননদ সাব্বিরকে খেলা করার জন্য মাটিতে নামিয়ে মোবাইলে  কথা বলতে থাকেন। এরমধ্যেই শিশু সাব্বির রিফাত ফুফুর চোখের আড়াল হলে শুরু হয় দৌড়ঝাপ। মা রেহানাও দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসেন। শুরু হয় খোঁজাখুজি। আধাঘন্টা পর বাড়ীর পাশের হাটু সমান পানির একটি ধানক্ষেত থেকে  শিশু সাব্বির রিফাতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথম সন্তানকে হারিয়ে পাগলপারা হয়ে যান রেহানা-মিন্টু দম্পতি। প্রথম সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে পরের বছর তারা আবারো সন্তান নেন। আবু সাঈদ নামে ওই সন্তানটি যাতে পানিতে ডুবে মৃত্যু না ঘটতে পারে সেজন্য বাড়ীতে না রেখে দুই বছর বয়সেই তাকে একটি আবাসিক মাদ্রাসায় পড়তে দেন। বর্তমানে ১০ বছর বয়সী আবু সাইদ এখনও ওই মাদ্রাসাতেই পড়ালেখা করছে। বাড়ীর কাছে শিশুযত্ন কেন্দ্র হওয়ায় দ্বিতীয় সন্তান আবু রায়হানকে এখন রেহানা বেগম সেখানে রেখে নির্ভার থাকছেন। ছেলেকে নিয়ে কোন ধরনের দুশ্চিন্তা নেই। রেহানা খাতুন বলেন, কেন্দ্রটি থাহনে আমরাও এখন ঘর-গেরস্থালীর কাজ আগাইতে পারছি। পুলাডাও লেহাপড়ায় মনোযোগী হয়েছে।
সরেজমিনে ‘ধানীখোলা শিশুযত্ন কেন্দ্রে’ পরিদর্শনকালে জয়গুন বেগম (৩০) নামে আরেক অভিভাবক বলেন, আমার ৪ বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস এক বছর ধরে এই দিবাযত্ন কেন্দ্রে আসা-যাওয়া করছে। এখানে আসার পর থেকে তার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সে এখন আগের চাইতে অনেক স্বত:স্ফুর্ত। এখানে যেসব শিখছে, বাড়ীতে গিয়েও তার চর্চা করছে। ছড়া বলছে, নানা অঙ্গভঙ্গি করে অভিনয় করছে, ছবি আঁকছে। বড়দের সম্মান করছে, ছোটদের আদর করছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আগে বাড়ীতে সবসময় মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকতো। এখন মোবাইলের আসক্তি অনেক কমেছে। সকাল হলেই সে কেন্দ্রে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তিনি জানান, তাদের এই এলাকায় অনেক পুকুর এবং মাছের খামার রয়েছে। আগে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু অনেক বেশী ছিলো। এনিয়ে তাদের অনেক টেনশন ছিলো। কিন্তু এই শিশুযত্ন কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু যেমন কমেছে, তেমনি তাদের টেনশনও অনেক কমেছে। চার বছর ৫ মাস বয়সী শিশু রাফা মনি বলে, এখানে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব। সবাই মিলে আনন্দ করি, পড়ি, খেলি। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করি।
কেন্দ্রটির সমন্বয়কারী নাজমিন নাহার (৩২) বলেন, এখানে ১-৫ বছর বয়সী শিশুরা সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমাদের তত্বাবধানে থাকে। একটি ঘরকে ৫টি অংশে ভাগ করে (স্বপ্নের ভুবন, রঙের ভুবন, গল্পের ভুবন, আপন ভুবন ও বাইরের ভুবন) দুইভাগে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়। ১-৩ বছর বয়সী শিশুরা যখন উদ্দীপনামুলক কাজ (গল্প, ছড়া, আঁকাআকি) করে তখন ৪-৫ বছর বয়সীরা বাইরে খেলাধুলা করে। আবার যখন ৪-৫ বছর বয়সীরা উদ্দীপনামুলক কাজের সময় ১-৩ বছর বয়সীরা বাইরে খেলাধুলা করে। তিনি তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, এই কেন্দ্রে আসার পর থেকে শিশুদের জড়তা যেমন কমেছে, তেমনি ছড়া, গান, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। মোবাইল ফোনের আসক্তি কমেছে। পারষ্পরিক মেলামেশার প্রবণতা বেড়েছে। খাবার গ্রহণের চাহিদাও বেড়েছে। শিশুরা এখানে নিরাপদে থাকছে।
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধের পাশাপাশি এসব শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষায় কাজ করছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশু একাডেমীর মাধ্যমে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান প্রকল্প (আইসিবিসি)’-এর আওতায় এসব শিশুযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।  সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ অব বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর গবেষক ডা. মো. আল-আমিন জানান, দেশে শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু। ৫ বছরের নীচে মারা যায় ৩০ জন। সবচেয়ে বেশী ঝুঁকি ১-৪ বছর বয়সীদের। শতকরা ৮০ ভাগ মৃত্যু ঘটে ঘরের ২০ মিটারের মধ্যে আর ৭০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে তত্বাবধানের অভাবে। সময়ের হিসাবে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে সবচেয়ে বেশী শিশুর মৃত্যু ঘটে। গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিউনিটি শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শতকরা ৮০ ভাগ পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
আইসিবিসি প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতাকারী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) ফেলো নাহিদা পারভীন বলেন, শিশুর প্রাক প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভকালীণ অবস্থা থেকে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সময় বলা হয়ে থাকে। তন্মধ্যে শিশুর জন্মের পর প্রথম ১০০০ হাজার দিন হলো প্ররাম্ভিক বিকাশের গোল্ডেন টাইম (সুবর্ণ সময়)। আইসিবিসি প্রকল্পের শিশুযতœ কেন্দ্রে প্রারম্ভিক বিকাশের উপযোগী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। যেটা খুব কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
আইসিবিসি প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের ১৬টি জেলায় ৩৫টি উপজেলায় ৮ হাজার শিশুযত্ন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে এসব শিশু যত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন কেয়ারগিভার বা সমন্বয়কারী এবং একজন সহায়ক ২৫জন শিশুকে তত্বাবধান করছেন। স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক গ্রাম কমিটির মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে একটি ঘরে এই কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চালু হওয়া এসব শিশুযত্ন কেন্দ্র আগামী ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কাল পর্যন্ত প্রকল্পটি চলবে। তিনি জানান, ময়মনসিংহ জেলার ৩টি উপজেলায় ৫০০ শিশুযত্ন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সমিতি (টিএমএসএস) এসব শিশুযত্ন কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে।
শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম শিশুর প্ররাম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সেইসাথে কেন্দ্রগুলোর সমন্বয়কারী ও সহায়কদের সম্মানী বৃদ্ধি, ঘরের অবস্থান ও সেবার মান বৃদ্ধি এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীপেশার আরও মানুষকে গ্রাম কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা।