রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম আইন বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান
হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ শ্রম আইন স্বীকৃত অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে গণমাধ্যমের সামনে হুমকি প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। নজির বিহীন এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তীব্র প্রতিবাদ জানায় হোটেল-রেস্তোরাঁ সেক্টরে সরকার ঘোষিত নি¤œতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক আক্তারুজ্জমান খান এবং যুগ্ম আহবায়ক আনোয়ার হোসেন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, গতকাল (১৩ জানুয়ারি) বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম কর্মিদের সামনে প্রকাশ্যে ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধিতা সহ শ্রম আইন না মানার ঔদ্ধত্যতা প্রকাশ করেন, যা ইতিপূর্বে অন্য কোন সেক্টরে লক্ষ্য করা যায় নি।
বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, বাংলাদেশে হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের শতাধিক রেজিস্ট্রার্ড বেসিক ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে এ সেক্টরের একমাত্র ক্রিয়াশীল ফেডারেশন হিসেবে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডাশেন ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করছে। ফেডারেশনের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা এবং শ্রমিকদের লড়াই-সংগ্রাম থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিগত সময়ে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই সরকার মালিক গোষ্ঠীর সাথে যোগসাজশে তাদের পকেটস্থ ভুঁইফোর ধরনের কিছু সংগঠন সৃষ্টি করেছে। এসব সংগঠনকে মালিকরা শ্রমিকদের আন্দোলন-সংগ্রামের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। অথচ মালিক সমিতির সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়- “বিগত সরকারের আমল থেকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ট্রেড ইউনিয়নের নামে রেস্তোরাঁ মালিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। কিছু কর্মচারী ও বহিরাগত ব্যক্তি শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় দিয়ে হুমকি-ধামকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে।” যদিও এ বিষয়ে সাংবাদিকরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানতে চাইলে মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ কোন জবাব দিতে পারেন নি। নেতৃদ্বয় বলেন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেক্টরে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি অবিলম্বে বাস্তবায়ন, নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র প্রদানসহ ৮ ঘন্টা শ্রমদিবস কার্যকর এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জেলা-অঞ্চলে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ দেশব্যাপী কর্মবিরতির কর্মসূচি আসে। যদিও দাবি বাস্তবায়নে গত ২৪ ডিসেম্বর এবং ৮ জানুয়ারি শ্রমভবনে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সরকারের তৎপরতার কারণে কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে মাালিক সমিতিরি ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা আইএলও কনভেন এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘণ।
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়েছে “আগামী নির্বাচনের পর সরকার-অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে কর্মীবান্ধব উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় বসতে আমরা প্রস্তুত।” এ প্রেক্ষিতে নেতৃদ্বয় বিবৃতিতে বলেন, শ্রম অধিদপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত প্রায় শতাধিক শ্রমিক সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে হোটেল-রেস্তোরাঁ সেক্টরে সরকার ঘোষিত নি¤œতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ এবং বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশন। এসব সংগঠনের উদ্যোগে ইতিমধ্যে মালিক সমিতিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অব্যাহতভাবে মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবিতে চিঠি, স্মারকলিপি প্রদান করে হয়েছে। অথচ সংবাদ সম্মেলনে মালিক সমিতি সরকার-অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনের কথা বলে আবারও নতুন কোন দালাল সংগঠন সৃষ্টির পাঁয়তারা চালানোর ইঙ্গিত প্রদান করে। এর ফলে মালিক সমিতি এই সেক্টরে সুষ্টু ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার বিপরীতে দালাল ও লুম্পেন শ্রমিক সংগঠনের নামে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত-বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয় “রেস্তোঁরা ব্যবসা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো নয়, এখানে শ্রমিক সুবিধার আনুষ্ঠানিক নথি সংরক্ষণ সম্ভব না হলেও মানবিক দায়িত্ব থেকে মালিকরা সবসময় কর্মচারীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন।” এ প্রেক্ষিতে নেতৃদ্বয় উস্মা প্রকাশ করে বলেন বাংলাদেশ শ্রম আইন মোতাবেক নিয়োগপত্র-পরিচয় প্রদানসহ রেজিস্ট্রার ও সার্ভিস বুক রাখার বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকে এর মাধ্যমে অস্বীকার করা হয়েছে, যা শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘণ। সমষ্টিগতভাবে রাষ্ট্রীয় আইন না মানার মালিক সমিতির এ তৎপরতা একটি নজিরবিহীন ঘটনা বলে নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন। নেতৃদ্বয় বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘণ করে বেপরোয়াভাবে ব্যবসার নামে লুটপাট চালানোর জন্য মালিক সমিতি তাদের সংবাদ সম্মেলনে স্ববিরোধী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। একদিকে তারা বলছেন করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয় বলে তাদের শ্রমিক সুবিধার আনুষ্ঠানিক নথি সংরক্ষণ সম্ভব নয়, আবার অন্যদিকে সঠিকভাবে কমপ্লায়েন্স মানছে না বলে স্ট্রীট ফুডের শ্রমজীবি মানুষদের প্রতি বিষোদাগার করেছেন।
নেতৃদ্বয় উস্মা প্রকাশ করে বলেন, দেশব্যাপী শ্রমিকরা যখন সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়নে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় তখন মালিক সমিতি তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার হুমকির মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবিকে উপেক্ষা করে উল্টো সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নেয়ার পাঁয়তারা করছে। নেতৃদ্বয় মালিক সমিতির উত্থাপিত জ¦ালানি সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিসহ মূল্যস্ফীতির বিষয়ের সাথে একমত পোষণ করে তার প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের সরকার ঘোষিত মজুরি বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় আইন প্রতিপালনের মাধ্যমে একটি সুষ্টু শিল্প পরিবেশ সৃষ্টি করে শিল্পের সংকটে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনে শ্রমিকদের সুযোগ দেয়ার আহবান জানান।
