কৃষি ও শিল্প

গৌরীপুরে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জেগে উঠছে  কৃষক!

মোখলেছুর রহমান, গৌরীপুর প্রতিনিধি:মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ময়মনসিংহের গৌরীপুরে এবার কৃষকের মাঝে জৈব ও গোবর সার ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। আমন ধান কাটা শেষে বোরো বীজতলা তৈরির সঙ্গে চলছে ফসলি জমির উর্বরতা বৃদ্ধির কাজও। যেদিকেই চোখ যায়, জৈব, কম্পোস্ট ও গোবর সারের কালো কালো ছোট ছোট টিবির দেখা মিলছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার নিলুফার ইয়াসমিন জলি জানান, এখন বোরো মৌসুম। যেসব জমির আমনের ধানকাটা শেষ সেখানে কৃষকরাও ইতোমধ্যে ইরিবোরো চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার জৈব, কম্পোস্ট, ভার্মি কম্পোস্ট ও কৃষকের খামারজাত কম্পোষ্ট ব্যাপক হারে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
সরজমিনে উপজেলার ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের শালীহর, গাভীশিমুল, কোনাপাড়া, ডৌহাখলা ইউনিয়নের তাঁতকুড়া, কাটাশিয়া, রুকনাকান্দা, কদিম ডৌহাখলা, ভাংনামারী ইউনিয়নের বারুয়ামারী, নাওভাঙ্গা, রামগোপালপুর ইউনিয়নের ধুরুয়া, শিবপুর, পাঁচাশী, গাঁওরামগোপালপুর, নওয়াগাঁও, গোপীনাথপুর, বোকাইনগর ইউনিয়নের নয়াপাড়া, বেতান্দর, গড়পাড়া, তারাপুর, অচিন্তপুর ইউনিয়নের গাগলা, মুখুরিয়া, ছিলিমপুর, মাওহা ইউনিয়নের নয়ানগর, বীরআহাম্মদপুর, সহনাটী ইউনিয়নের সোনাকান্দি, ভালুকাপুর, রাইশিমুল, ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামে দেখা যায় শত শত কৃষক তাদের জমি বোরো ধান রোপনের জন্য প্রস্তুত করছেন।
শালীহর গ্রামের মৃত সাবেদ আলীর পুত্র মো. জালাল উদ্দিন (৭২) জানান, মাইনসের কইলজার মতোই মাটির কইলজা ওইলো গোবর সার। গয়াইলের মাগনা গোবর, রান্ধনের ছাই আর বাড়ির ময়লা-আবর্জনা গাতার মাদ্যে  ফালাইয়্যা পচাইয়্যা নিজেরাই এই সার বানাই। টেহা লাগে না। তিনি আরও বলেন, এই সার দিলে মাটি লড়াচড়া কইর‌্যা উঠে, মনে অয় জানডা আইছে আর ধানও বালা অয়। এ কৃষকের সঙ্গে তরুণ কৃষক শহিদ মিয়ার পুত্র রতন মিয়া জানান, নিজেদের তৈরি পঁচা গোবর সার দিলে জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার কম লাগে, অধিক ফলন হয়।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার জানান, নিজেদের খামার তৈরি কম্পোস্ট বা গোবর সার ব্যবহার করছেন। এ সার ব্যবহারের কারণে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমবে। কৃষকদের আমরা সবসময় বলি, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য জৈব সারের বিকল্প নেই। তিনি আরো জানান, রোপনের জন্য এখন জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, অনেক কৃষক জৈব সার, ভার্মি কম্পোজ সারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ সার ব্যবহার করলে ফসল বাড়বে, বাঁচবে কৃষক, বাঁচবে জমি ও ক্ষতিকর অনেক প্রভাব থেকে ফসলি মাটি, কৃষক ও ফসল রক্ষা পাবে।
উচাখিলা কেরামতিয়া আলিম মাদরাসার প্রভাষক এলাকার আদর্শ কৃষক মো. খাইরুল ইসলাম জানান, মাটির প্রাণ হলো জৈব সার। অধিক রাসায়নিক সার ব্যবহার এবং অধিক ফসল উৎপাদনের কারণে জমির উর্বরতা শক্তি জমে যায়। জৈব সার জমির স্বাস্থ্য ভালো রাখে, উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। তাই এ এলাকায় প্রায় সব কৃষক এখন গোবর বা জৈব সার ব্যবহার করেন।
উপসহকারী কৃষি অফিসার সুমন সরকার জানান, জৈব সার মাটির জীবাণুর খাদ্য উৎস, অ্যাসিড মাটিকে অ্যালুমিনিয়াম ও ফেরিক বিষাক্ততা থেকে রক্ষা করে, মাটির গঠন, জল ধারণ ক্ষমতা উন্নতকরণ এবং মাটির ঘনত্ব কমিয়ে ফসল উৎপাদন বাড়ায়।
উপসহকারী কৃষি অফিসার মো. শরীফুল ইসলাম জানান, ক্যাটায়ন বিনিময় ক্যাপাসিটি (সিইসি), যা পুষ্টির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করে এবং তরলের মাধ্যমে পুষ্টির বেরিয়ে যাওয়া রোধ করে। উদ্ভিদের পরজীবী নেমাটোড এবং ছত্রাক মাটিতে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে মাটিতে অণুজীবের ভারসাম্য পরিবর্তন করে। সামগ্রিক মাটির সমষ্টিগত স্থায়ীত্ব রক্ষা করে, যা মাটিকে সর্বোত্তম পর্যায়ে কাজ করতে সাহায্য করে এবং সর্বোত্তম ফলন পেতে সাহায্য করে।
শালীহর গ্রামের মৃত আক্তার আলীর পুত্র কৃষক আব্দুল গণি জানায়, কৃষকরাই এখন ফসল আর মাটি বাঁচাতে গোবর সার ব্যবহার করছে। আমরা ৭০শতাংশ জমির সবখানেই গোবর সার ব্যবহার করেছি। এ কৃষকের সূত্র ধরে মৃত সাবদুল আলীর পুত্র নজরুল ইসলাম জানায়, কয়েক বছর ধরে এ সার ব্যবহারের কারণে ধানে পোকার আক্রমণ ও রোগ-বালাইও কমে গেছে।
একই গ্রামের মৃত কাজিম উদ্দিনের পুত্র কৃষক তারা মিয়া জানায়, পঁচা গোবর, বাড়ির পচনশীল আবর্জনা, কাঠের গুড়া, খৈল, কচুরিপানাসহ নানা উপকরণ পঁচিয়ে সাধারণত জৈব সার তৈরি করা হয়। গোয়ালঘর থেকে গোবর ছায়ায় রেখে পঁচিয়েও ব্যবহার করি। জৈব সার উদ্ভিদের শিকড়ের গভীরে প্রবেশ করে। গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। রামগোপালপুর ইউনিয়নের বেরাটি গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, সব ফসল উৎপাদনে এখন জৈব সার ব্যবহার করা হয়। প্রায় বিনাখরচে হওয়ায় এর ব্যবহারও দিনদিন বাড়ছে।