ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা ও সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনের বিবৃতি
( বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ নেত্রকোনা জেলার সাধারণ সম্পাদক ও নেত্রকোনা জেলা হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় গত ১২ মে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তার সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে জামিনে মুক্তির পর গত ৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে আনোয়ার হোসেন তার ফেসবুক আইডি থেকে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। তার বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো)
সংগ্রামী সাথীরা,
রক্তিম শুভেচ্ছা নিবেন। সারাদেশের হোটেল শ্রমিকসহ বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রাম ঐকান্তিক চেষ্ঠায় গত ৪ জুন ২০২৫ তারিখে আমি জামিনে মুক্তি লাভ করি। গত ১২ মে নেত্রকোনা জেলা হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ষড়যন্ত্রে এক মিথ্যা মামলায় আমাকে গ্রেফতার করা হয়। কোর্ট প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল খানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর থানায় যেয়ে জানতে পারি, ২০২৩ সালের ২২ মে বিএনপি’র কর্মসূচিতে আওয়ামীলোগের নেতাকর্মীরা হামলা করেছে- এই অভিযোগে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে এক মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ২৫২ জন এজাহারনামীয় আসামি এবং ৭/৮শ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। আমাকে এজাহারনামীয় ৯৩ নম্বর আসামি করা হয়। আওয়ামিলীগের বিরুদ্ধে বিএনপি’র দায়েরকৃত রাজনৈতিক মামলায় জরুরি ভিত্তিতে আমাকে সর্বপ্রথম গ্রেফতার করার কারণ কি- বিষয়টির ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।
সাথীরা,
আপনারা জানেন নেত্রকোনা জেলায় কর্মরত হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের কাজের কর্মঘণ্টা ও নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র প্রদানসহ বাংলাদেশ শ্রম আইনের কোন কিছুই মালিকরা প্রতিপালন করে না। বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের নেত্রকোনা জেলা কমিটি গঠনের পর থেকে শ্রমিকরা শ্রম আইন বাস্তবায়নসহ বাজারদরের সাথে সঙ্গতিরেখে মজুরির দাবিতে হোটেল রেস্তোরাঁর শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছে। এ প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে নেত্রকোনা শহরে সমস্ত হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিকরা দুইদিন কর্মবিরতি পালন করে এবং ২৪/১০/২০১৯ ইংরেজি তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র প্রদান করার সিদ্ধান্ত থাকলেও অদ্যাবধি তা বাস্তবায়ন করা হয় নি। এই দীর্ঘসময়ে যতজন জেলা প্রশাসক এসেছেন প্রত্যেকের কাছে শ্রমিকরা চুক্তি বাস্তবায়নের স্মারকলিপি দিয়েছেন, কিন্তু বিভিন্ন গড়িমসির মাধ্যমে মালিকরা তা আর বাস্তবায়ন করে নি। পরবর্তীতে নেত্রকোনা জেলা হোটেল রেস্তোরাঁ মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিষ্ট্রেশন আনা হয় এবং ৭ দফা দাবিনামা তৈরি করে মালিক সমিতির কাছে দাবিনামা প্রদান করা হয়। একইসাথে এই দাবিনামা বাস্তবায়নের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে পাঠানো হয়। সর্বশেষ ১৬ মে ২০২৫ ইংরেজি তারিখে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ইউনিয়নের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা নেয়া হয়।
আন্দোলন দমনের জন্যই মালিক সমিতি একের পর এক গোপন সভা করে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক অপ-তৎপরতা চালায়। এর অংশ হিসেবেই বিএনপি’র কাঁধে ভর করে এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আমাকে আসামি করা হয়। প্রশ্ন হলো- বিএনপি’র জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ কি জেনেশুনে আমাকে আসামি করেছেন? অবস্থাদৃষ্টে তা মনে হয় নি। কারণ বিএনপি’র জেলা আহবায়ক জনাব অধ্যাপক ডাঃ মোঃআনোয়ারুল হক সাহেব এবং বিএনপির নেত্রকোনা জেলার অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আমাকে আসামি করার ব্যাপারে অবগত নয় বলে জানান এবং আমার জামিনের জন্য (নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সকল নেতৃবৃন্দ) সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছেন। তাহলে বোঝা যায়, নিশ্চয়ই বিএনপি’র অন্য কোন নেতাকে মালিক সমিতি বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে হোটেল শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করতে এই মামলায় আমাকে জড়িয়েছে।
২০১৯ সালে আন্দোলনের সময়েও আমরা দেখেছি মালিক সমিতির অনেক নেতা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা ছিলেন। মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি দেবু শাহ আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মীদেরকে নিয়ে শ্রমিকের ন্যায্য আইনি অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বিএনপি জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য জঙ্গি আন্দোলন হিসেবে অভিযুক্ত করেন। হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল খান জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে শ্রমিকদের আন্দোলনকে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে নিয়ে প্রতিহত করার হুমকি দেন। ভিপি দেবু সাহা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ব্যবহার করে শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের চেষ্ঠা করেছেন। আওয়ামীলীগের নেতাদের দিয়ে শ্রমিকদের দমন করতে মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল সাহেব তখন আওয়ামীলীগের নির্বাচনের প্রচারপত্র বিলি করাসহ আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে দহরম মহরম সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদেরকে দিয়ে আমি সহ হোটেল শ্রমিক সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। কারো কাছে বিচার না পেয়ে সর্বশেষ গয়নাথ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক এবং মালিক সমিতির নেতা বাবুল চন্দ্র মোদক এবং খান মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক ও মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করি।
সাথীরা,
আমি একজন সাধারণ মেসিয়ার হিসেবে হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করি। ফলে কোন মালিকের সাথেই আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার প্রেক্ষিতে সংগঠন সংগ্রাম করার কারণেই মালিকদের সাথে আমাদের শ্রেণিবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মিমাংসার স্থায়ী কোন সমাধান নেই। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত পুঁজির শোষণ থাকবে ততক্ষণ শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সম্ভব নয়। তাই আমরা লড়ছি পুঁজির শোষণ উচ্ছেদের লক্ষ্যে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমরা শ্রমিকদের নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যায় বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলেছি। এসব আন্দোলন সংগ্রামের আপাত একটা আপোস-মিমাংসা-সমঝোতায় আসা যায় রাষ্ট্রীয় আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে। কিন্তু নেত্রকোনা জেলার রেস্তোরাঁ মালিকরা এই আইন বাস্তবায়ন করতে চায় না, বরং দাম্ভিকতা দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। এর বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম। এই সংগ্রামে যেহেতু আমরা নতুন এবং খোদ শ্রমিক থেকে উঠে আসা আমাদের নেতৃত্ব, তাই শ্রেণি সচেতনতা ও রাজনৈতিক সচেতনতার দুর্বলতায় আমাদের কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামীলীগের এক (বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করার সময় আমাদের কাছে আসেন। তিনি তার নির্বাচনী অফিসে আমাদের চা খাওয়ার দাওয়াত দেন। আমি সরলমনে এই দাওয়াতে অংশগ্রহণ করি। এর সপ্তাহখানেক পরেই বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের জেলা কমিটির সভায় এই বিষয়টি আলোচ্যসূচি হিসেবে উত্থাপিত হয়। কেন্দ্রিয় প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সভায় প্রায় সকল নেতৃত্ব আমাকে সমালোচনা করেন। আমি তাদের সমালোচনা গ্রহণ করি এবং পরবর্তীতে সতর্ক থাকি। আমি মনে করি, ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামে বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন একসাথে থাকতে পারে। কিন্তু যে মতাদর্শ শ্রমিক শ্রেণিকে শ্রেণি চেতনায় শাণিত করবে না, সেই মতাদর্শ শ্রমিক শ্রেণি ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় জায়গায় প্রতিক্রিয়াশীল ধারার নেতৃত্ব থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত।
বন্ধুগণ,
আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে আমি গ্রেফতার হওয়ার পর নেত্রকোনা জেলা হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিক ইউনিয়ন ও জেলা ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের নেতৃবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরদিন আমার জামিন না হওয়াতে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের ব্যানারে আবারও শহরে মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সুপরিচিত কেন্দ্রিয় নেতৃত্বও উপস্থিত থাকেন। এতে অন্যান্য দুই একটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দও আমার মুক্তির প্রতি সংহতি জানান। অথচ দু:খজনকভাবে জেল থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় দেখলাম আমাকে খেলাফত আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। একই সাথে আমার মুক্তির দাবিতে যারা আন্দোলন করছে সেটিকেও খেলাফতের আন্দোলন বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। কি ভয়ানক অবস্থা! আমাদের গণমাধ্যম কর্মিরা অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং আমার মুক্তির জন্য গণমাধ্যম কর্মিদের অনেকেই চেষ্ঠা করেছেন বলে অবগত হয়েছি। কিন্তু আমার সাংগঠনিক পরিচয় এবং শ্রমিকদের আন্দোলনকে একটা খেলাফত শ্রমিক আন্দোলনের নামে নিউজ হওয়াতে সারাদেশের শ্রমিকরা বিভ্রান্ত হয়েছেন। এতে সারাদেশের শ্রমিকদের কাছে আমি লজ্জিত ও অত্যন্ত বিব্রত হয়েছি। সংবাদ কর্মিদের কেউ কেউ বলেছেন- তারা কোন একজনের লাইভ দেখে ও তার মৌখিক কথার উপর ভিত্তি করে রিপোর্ট করেছেন। একজন সংবাদ কর্মি হিসেবে আমি মনে করি, কোনভাবেই একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে এভাবে নিউজ করাটা কাম্য নয়। বিশেষত ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন এবং হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন এ অঞ্চলে অত্যন্ত সুপরিচিত নেতৃত্ব। তাদের উপস্থিতিতে যে আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি তা খেলাফত শ্রমিক আন্দোলনের নামে চালিয়ে দেয়া অত্যন্ত দু:খজনক বিষয়। এতে সারাদেশের শ্রমিকরা বিভ্রান্ত হওয়াতে মালিক গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে। যদিও আমাকে গ্রেফতারের বিষয়টি ছিল ষড়যন্ত্রমূলক – এই বিষয়টি শ্রমিকরা নিশ্চিত হওয়ায় তারা আমার মুক্তির জন্য আন্দোলন চলমান রেখেছিল।
আমি দীর্ঘদিন ধরে নেত্রকোনা শহরে রেস্তোরাঁ কর্মি হিসেবে কাজ করে আসছি। এতে অনেকের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। সামাজিক, পারিবারিক সূত্রে অনেকের সাথে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসা হয়েছে। তবে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর কিছুটা রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হলে আমি সবসময় আমার সাধারণ জ্ঞান দিয়ে যতটুকু বুঝেছি প্রতিক্রয়াশীল রাজনৈতিক চর্চা থেকে দূরে থেকেছি। তারপরও আমার যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা গ্রহণের তেমন সুযোগ হয় নি এবং রাজনৈতিক পড়াশোনাতেও এখনো অনগ্রসর সেহেতু বিভিন্ন সময় আমার ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আপনাদের সম্মিলিত চেষ্টা, সহযোগিতা ও উৎসাহে এবং আমার সংগঠন- সংগ্রামের চেষ্ঠায় আমি আশাবাদী আমি আরো যোগ্যতর ভূমিকায় যেতে পারবো- এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। নেত্রকোনা জেলা হোটেল রেস্তোরাঁ মিষ্টি বেকারি শ্রমিকদের ৭ দফার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।