হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু -মোঃ মাসুদ মিয়া
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে একটি সফল দেশের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর মাধ্যমে শিশুদের বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পোলিও নির্মূল, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণ, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ এবং হামের সংক্রমণ অনেকাংশে কমিয়ে আনার সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের টিকা ব্যবস্থাপনায় সংকট এবং এর প্রভাবে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। সরকারের জরুরি পদক্ষেপে ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দিনেই ৩০টি উপজেলায় ৭৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে । এ ছাড়া ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে অবশিষ্ট এলাকায় কর্মসূচি শুরু হবে। একই সঙ্গে রোববার থেকে দেশে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)
বাংলাদেশে শিশুদের জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন ধাপে বিনামূল্যে ১২টি সংক্রামক রোগের টিকা সরবরাহ করে থাকে। যেমন, শিশুদের জন্মের পরপরই: বিসিজি (যক্ষ্মা), ওপিভি-০ (পোলিও); শিশু জন্মের পর ৬ সপ্তাহ বয়সে: পেন্টা-১, পিসিভি-১, ওপিভি-১, আইপিভি; ১০ সপ্তাহ বয়সে: পেন্টা-২, পিসিভি-২, ওপিভি-২; ১৪ সপ্তাহ বয়সে: পেন্টা-৩, পিসিভি-৩, ওপিভি-৩; ৯ মাস বয়সে: এমআর (হাম-রুবেলা প্রথম ডোজ); ১৫ মাস বয়সে: এমআর (দ্বিতীয় ডোজ) ইত্যাদি। এই সময়সূচি মেনে টিকা দেওয়া হলে শিশু প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
হাম কী, কেন ও কীভাবে ছড়ায়?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। সংক্রমণের উপায়গুলো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে, একই কক্ষে অবস্থান ইত্যাদি। হাম এতটাই সংক্রামক যে, টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই আক্রান্ত হতে পারে। হাম সাধারণত ৭–১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো- উচ্চ জ্বর, কাশি ও সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (র্যাশ), মুখের ভেতরে সাদা দাগ। র্যাশ সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। হাম শুধু সাধারণ জ্বর নয়, এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে- নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানপাকা, মস্তিষ্কের প্রদাহ, অপুষ্টি, অন্ধত্ব (ভিটামিন এ-এর অভাবে)। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে। যদিও দেশে ৮৮ শতাংশ শিশু দুই ডোজ টিকা পেয়েছে, তবুও কিছু কারণে প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে- অনেক শিশু সম্পূর্ণ টিকা পায়নি, দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়া, কোভিড-পরবর্তী ড্রপআউট, শহর ও গ্রামে টিকাদানের অসমতা, জনসচেতনতার অভাব। এই টিকাবঞ্চিত শিশুরাই এখন সংক্রমণের মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জ্বর ও র্যাশ হলে অভিভাবকদের করণীয় হলো দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, শিশুকে অন্তত ৫ দিন আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ খাওয়ানো। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বারবার বমি, চোখ ঘোলা হয়ে যাওয়া এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ রোধে রোববার শুরু হয়েছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পাবে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুরা। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও শিশুরা এই ক্যাম্পেইনে টিকা নিতে পারবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, অসুস্থ শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে না। তবে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত হবে, যেখানে হামের সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি।৩ মে থেকে সারা দেশে অবশিষ্ট এলাকায় টিকা কর্মসূচি চালু হবে।
হাম রোগে অধিকতর আক্রান্ত হটস্পট স্থানগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ অন্যতম। ময়মনসিংহ জেলার সদর, ত্রিশাল এবং ফুলপুর উপজেলায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টিকার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহমেদ শাফি। কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত বয়সের শিশুদের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। ক্যাম্পেইন উদ্বোধন শেষে সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাম প্রতিরোধ করার জন্য ত্বরিতগতিতে এ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হবে। কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৪ নতুন শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৭২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে ময়মনসিংহে হামের লক্ষণ নিয়ে ২৪৮ জন শিশু ভরতি হয়েছে যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭০ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিশুদের প্রাণঘাতী হাম মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সরকার জরুরি টিকা সংগ্রহ বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন, টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ,মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ডেটা সংগ্রহ, এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। জনগণের সচেতনতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়- নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ইপিআই কর্মসূচির আওতাভুক্ত টিকা নিশ্চিত করা; টিকাদান সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা; অসুস্থ শিশুকে আলাদা রাখা; স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইত্যাদি। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু সরকারে একার পক্ষে এ সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ- সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জনগণ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের জীবন রক্ষা করা শুধু স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী।
লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

